প্রবাদ আছে ‘ধান সুপারি ইলিশের গোলা, এই তিনে ভোলা’। দেশের এক মাত্র দ্বীপ জেলা ভোলায় ধান, সুপারি, আর ইলিশে স্বয়ংসম্পন্ন। তবে ধান আর ইলিশ উৎপাদনে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর গুলো সক্রিয় ভুমিকা পালন করলেও সুপারির বিষয়ে তদারকি নেই কারোই। এতে হতাশা প্রকাশ করছেন সুপারি চাষীরা।
জেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরে জেলায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে ৯৬ হাজার মেট্রিক টন কাঁচা পাকা সুপারি উৎপাদন হয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা। হেক্টর প্রতি কাঁচা ৭ থেকে ৮ মেট্রিক টন সুপারির ফলন হয়েছে। শুকনোর পর যা হেক্টর প্রতি ৫ মেট্রিক টন হয়। যার বাজার মূল্য প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
তবে চাষীরা বলছেন, চাষীদের একক প্রচেষ্টায় সুপারি শত বছর ধরে কৃষি পন্য ও দেশের অর্থনীতিতে ব্যপক ভুমিকা রাখছে। বছরে কোটি কোটি টাকার সুপারি বেচাকেনা হলেও সরকার বা স্থানীয় কৃষি বিভাগের নেই কোন তদারকি বা উদ্যেগ। এতে হতাশা প্রকাশ করছেন তারা। চাষীরা নিজ উদ্যেগে সুপারিকে আজ অন্যতম বানিজ্যিক ফসলে পরিনত করেছে।
তাদের অভিযোগ, জেলার অন্যতম অর্থকরী এ ফসলে প্রচার ও প্রসারে কৃষি বিভাগের নেই কার্যক্রম। শুধু কাগজ কলমে হিসাব রাখার মধ্যেই তাদের কাজ সীমাবদ্ধ। কৃষি বিভাগের কোনো প্রকল্প বা আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির নির্দেশনা না থাকায় কৃষকেরা এখনও সেই পুরনো ধাঁচে সুপারি চাষ করছেন। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি, গুণগতমান ও বিপণনে রয়েছে নানা সমস্যা। এই খাত উন্নয়নের জন্য সরকারি বেসরকারি উদ্যেগ গ্রহনের দাবী জানিয়েছেন তারা।
চাষীদের তথ্যমতে, ভোলায় ‘গা’ ও ‘ভি’ হিসেবে সুপারি কেনাবেচা চলছে। ৩২০ পিছ সুপারিকে বলা হয় এক ‘ভি’ এবং ১০ পিচ সুপারিকে বলা হয় ১ গা। একেকটি গাছ থেকে দুই থেকে তিন ভি সুপারি পাওয়া যায়। এবছর প্রতি ভি সুপারি সাইজ অনুযায়ী ৪৫০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সুপারি মূলত পানের সঙ্গে খাওয়ার প্রচলন থাকলেও এর ঔষধি গুণাগুণ রয়েছে। এছাড়াও পশুখাদ্য, প্রাকৃতিক রঙ তৈরি ও হস্তশিল্পসহ নানাবিধ কাজে ব্যবহার হয়। স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় ভোলার সুপারির কদর রয়েছে সারা দেশেই।
অন্য কৃষি ফসলের তুলনায় সুপারি অনেক লাভজনক। যেখানে ধান বা সবজি বছরে শতাংশ প্রতি এক থেকে দেড়হাজার টাকার ফসল পাওয়া যায়। সেখানে সুপারি পাওয়া যায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায়। একেকটি গাছ থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ বছর পযর্ন্ত ফল পাওয়া যায়। এছাড়াও সুপারি গাছ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে পরিবেশ রক্ষায় ভুমিকা পালন করে।
ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার কয়েকটি সুপারি বাগান ঘুরে দেখা যায়, সুপারি চাষীদের ভরা মৌসুম চলছে। তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রতিটি বাগানে যেন এক উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। দিনেও রাতে সুপারি বাগানগুলো জাকজমক হয়ে উঠেছে। গাছ থেকে সুপারি পারতে কাজ করছেন শ্রমিকরা। তারা এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে গিয়ে সুপারি পারছেন। ভোলার প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখা মিলছে সুপারি আর সুপারি। এ যেন জেলা জুড়ে নবান্ন উৎসবের মত ভিন্ন আমেজ কাজ কাজ করছে।
শ্রমিকরা পারিশ্রমিক হিসেবে প্রতিটি গাছ থেকে সুপারি পেড়ে একেক ছরা সুপারির জন্য ৭ টাকা করে নেন। এতে তারাও ব্যস্ত সময় পার করছেন। তারা খুব অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, এক গাছ থেকে লাফিয়ে অন্য গাছে উঠে নামিয়ে আনেন সুপারির ছরা।
ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের হাওলাদার বাড়ির জাকির হাওলাদার বলেন, আমার দেড় একর জমিতে ১৫০০ সুপারি গাছ রয়েছে। এ বছর গাছের পাতা লাল হয়ে শতাধিক গাছ মারা গেছে। কৃষি বিভাগের সহায়তা না পাওয়ায় আমরা গাছের সঠিক যত্ন করতে পারছি না। ফলে আমাদের ফলন কম বেশি বোঝার উপায় নেই।
তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর তাদের এই বাড়িতেই প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার সুপারি উৎপাদন হয়। কিন্তু তাতেও কৃষি অফিস থেকে নূন্যতম সারা পাওয়া যায় না। কয়েকবার কৃষি অফিসে গেলেও কর্মকর্তারা তেমন গুরুত্ব দেয় না। সুপারি খাতের প্রতি সরকারের সহযোগীতা কামনা করেন তিনি।
দৌলতখান উপজেলার জাহাঙ্গীর আলম বলেন,
‘আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতায় সুপারি চাষ করি। কিন্তু কীভাবে ফলন বাড়ানো যায় বা রোগবালাই প্রতিরোধ করা যায় সে বিষয়ে কৃষি অফিস থেকে কেউ আসেন না। সরকারের সহায়তা পেলে আমরা আরও ভালোভাবে উৎপাদন করতে পারতাম।’
কৃষি বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোলার জলবায়ু ও মাটির গুণাগুণ সুপারি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও সরকারি প্রণোদনা পেলে এ খাত থেকে জেলার অর্থনীতিতে আরও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব যোগ হতে পারে।
ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খায়রুল ইসলাম মল্লিক জানান, ভোলার সুপারির বেশ সুনাম রয়েছে। স্বাদ ও মানে ভালো হওয়ায় এর চাহিদাও বেশি। সুপারি উৎপাদনে ভোলার অর্থনীতিতে ব্যাপক ভুমিকা রাখলেও সরকারিভাবে এর জন্য সহায়তা বরাদ্দ নেই। তবে সুপারি চাষীরা যদি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাহলে কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে কৃষি বিভাগ। এছাড়াও সুপারি চাষীদের যেকোন পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় ছয় কোটি ৪২ লাখ সুপারি গাছ রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি এর সংখ্যা আরও বেশি অনেক বেশি।


