দখল করিয়া লইবার ব্যাপারটি নিতান্তই মন্দ নহে। কিন্তু কর্তা নিজেও জানেন না যে তিনি অন্যের জায়গা দখল করিয়া বসিয়া আছেন, অথচ প্রকৃত মালিক শেষ সম্বলটুকু হারাইবার দুঃখে দুঃখে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করিবার প্রয়াস মাত্র করিতেছে। কিন্তু কর্তা যদি জানিতেন যে তাহার রাজ্যের এক প্রজার এমন করুণ অবস্থা, তবে হয়তো সেদিন খোদার আরশ হইতে কিছু দয়া তাহার উপর অর্পিত হইত। কিন্তু এমন সৎ গুণাবলীর আদর্শ কর্তার রাজ্যের এক কোণে বসবাস করিবার শেষ ইচ্ছাটুকুই আমার এই করুণ পরিস্থিতি তৈয়ার করিয়াছে। আমি হয়তো বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই যে বাবুর রাজ্যে এত বৃত্তের বসবাস, যে বাবু যাহা কররূপে উসুল করেন তাহা তাহার রাজ্যের প্রজাদের নিকট এক নৈমিত্তিক বিষয় মাত্র। কিন্তু ইহা যে আমার শেষ সম্বলটুকু কাড়িয়া লইবে, ইহা আমি বুঝিতে পারি নাই। তবে যদি পূর্বে এতটুকু অনুধাবন করিতে পারিতাম যে বাবুর রাজ্যে বসবাস করিতে মোটা অঙ্কের কর গুনিতে হইবে , তবে আমার শেষ সম্বলটুকু লইয়া হয়তো অন্যত্র প্রস্থান করিতাম।
কিন্তু আমি না হয় বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই, তবে আপনি তো নিষ্ঠাবান, আদর্শ কর্তা- আপনার নির্দেশেই তো সেদিন আমি কুঁড়েঘরটি তুলিয়া লইয়াছিলাম , নতুন করিয়া চাষাবাদ করিয়া বাঁচিবার স্বপ্ন বুনিলাম। হয়তো সেদিন আমার হাতে এতটুকু অর্থও ছিল না যে আপনাকে কর গুনিবো। কিন্তু সেদিন তো আপনি আমার চাষাবাদের উচ্চ নীতি এবং আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধায় সন্তুষ্ট হইয়া ভবিষ্যত সর্বোচ্চ কর গুনিতে আমাকে আপনার রাজ্যে ক্ষুদ্র কুঠি নির্মাণের অনুমতি দিয়াছিলেন। কিছুদিন তো আমার জমির দেখাশোনার দায়িত্ব আপনি স্বহস্তে গ্রহণ করিয়াছিলেন। আমি তো আপনাকে বলিয়াছিলাম, আমার শস্য ঘরে তুলিবা মাত্রই আপনার কর যথাসময়ে পাঠাইয়া দিব। আপনিও এই চুক্তিতে সম্মত হইলেন।
তবে আপনার রাজ্যে ভূমিহীনের বসবাস আপনার সম্মান হানি করিবে—ইহা যদি আমি বুঝিতাম, তবে বাবু, সত্যই বলিতেছি, আমি আপনার রাজ্য বহুকাল পূর্বেই ত্যাগ করিতাম। কিন্তু আজ আপনার মনো মল্লারা অপক্ব শস্য কররূপে লইয়া আমাকে নিঃস্ব করিলেন—ইহার কি পরিণাম হইবে? আপনার হাসি-ঠাট্টা, তামাশার অন্তরালে ‘উচ্ছেদ’ শব্দের মর্ম এখন বুঝিতে পারিতেছি; আপনার মুখেও যে উর্বরতা রহিয়াছে। তবে বাবু, আমার শ্রদ্ধার রেশটুকু বোধ হয় আপনার প্রাসাদের প্রাচীর ভেদ করিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিতে পারে নাই; অথবা সস্তা উপঢৌকনের বাক্সে যে আমার সর্বোচ্চ সম্বলটুকু অর্পণ করিবার স্বপ্নটুকু পাঠাইয়া ছিলাম , তাহা আপনার অন্দরমহলের প্রহরীরা প্রাসাদে প্রবেশ করিতে দেয় নাই।
যদি আপনার মনো-মল্লারা আপনার মতো কিছুটা দয়াবান হইত, তবে হয়তো তাহারা আমার শেষ সম্বলটুকু কররূপে লইয়া যাইত না। বাবু, আমি আপনাকে দোষারোপ করিব না; কারণ আপনার দয়া তো একবার আমার উপর অর্পিত হইয়াছিল। কিন্তু ইহা আমার কর্মের দোষ, অথবা আমার কপালের দোষ। এ এক অদ্ভুত রকমের খোদার খেলা। কিন্তু শ্রেষ্ঠ জীবের ক্ষুদ্র, জংধরা মস্তিষ্ক কি তাহার উদ্ঘাটন করিতে পারে? আর করিলেও বা লাভ কি তাহাতে? লাভের অঙ্কটি বাদই দিলাম বটে। কিন্তু কর্তার মনো মল্লারা যে জমির অযত্ন করিয়া তাহাকে আফলা বানাইয়া ফেলিয়াছে—ইহার কি হইবে? আর আগাছার এমন পরিমাণ বৃদ্ধি ঘটিয়াছে যে, তাহা পরিষ্কার করিয়া পুনরায় চাষাবাদ করিব, না ক্ষুধার জ্বালা মিটাইতে জন্য অন্যের নিকট ধরনা দিবো?
আমার ক্ষুধার জ্বালা এত পরিমাণ তীব্র হইয়া উঠিয়াছে যে প্রায় দুই যুগ অনাহারে আছি বলিয়া মনে হইতেছে। কিন্তু অন্যের দেয়া দুমুঠো অন্ন কি আমার পেট ভরাইবে? ইহার উদ্ঘাটন করিতে করিতে আমার জমিটুকু যেন আমাজনের রূপ তৈয়ার করে নিয়েছে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যে আমার ভাগ্যে এককালীন আয়ু লিখিয়া রাখিয়াছেন কষ্ট করিবার লাগি —ইহার তো আর ব্যত্যয় ঘটিবে না। তবে, পরিষ্কার করিয়া পুনরায় চাষাবাদ করিবার প্রয়াস মাত্র।
তবে কর্তা, মনে রাখিবেন—আপনার বৃত্তের চাহিদা জেনেও আমি সর্বোচ্চ কর গুনিতে প্রস্তুত ছিলাম। তবে আমি বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই যে আপনি আপনার মনো মল্লাদের কথায় আমাকে উচ্ছেদ করিবেন। ইহা আমার নিকট সেই অপরিচিতার অনুপমের এক রাশ জায়গা পাওয়ার কাহিনী হয়ে থাকবে। হয়তো একদিন খোদার রহমতের দ্বার আমার জন্য উন্মুক্ত হইবে; সেদিন হয়তো আপনিও জানিবেন, ঐ জমির প্রকৃত মালিক আমিই ছিলাম। আপনার অগোচরে আপনার মনো মল্লারা তাহা আপনার চাষের জন্য দখল করিয়া লইয়াছিল। আপনি নিজেও চাষ করিলেন না, আমাকেও করিতে দিলেন না। কিন্তু সেদিন জানিয়া বা লাভ হইবে কি? সেদিন তো খোদা আমার জন্য তাহার রহমতের দামী রিজিকটুকু পাঠাইবেন । সেদিন হয়তো আমার ক্ষুধার জ্বালা নিবৃত্ত হইবে। আর আপনার মনো মল্লাদের ইচ্ছাও পূর্ণ হইবে—যে কর্তার সম্মান রক্ষা পাইয়াছে। আমিও ইহার আশা ত্যাগ করিয়াছি। সেদিন ঐ জমি আপনি একাই চাষ করিয়েন।
হাসান মিয়া
ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা কলেজ।


