সর্বশেষ

বরিশাল-৫ আসনে অভিজ্ঞ সারোয়ার বনাম ইসলামী জোটের লড়াইয়ের আভাস

মজিবর রহমান নাহিদ, বরিশাল :

বরিশাল মহানগরী ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন বরিশাল-৫। স্বাধীনতার পর থেকেই এই আসন জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে। রাজনৈতিক প্রভাব, ভোটের অঙ্ক ও নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বরিশাল-৫ বরাবরই ব্যতিক্রমী গুরুত্ব বহন করে আসছে।

১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় দিয়ে এই আসনের নির্বাচনী ইতিহাস শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে সবচেয়ে দীর্ঘ ও সুসংহত আধিপত্য গড়ে তোলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচনী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ পর্যন্ত বিএনপি ৭ বার, আওয়ামী লীগ ৫ বার এবং জাতীয় পার্টি ১ বার এই আসনে বিজয়ী হয়েছে। তবে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক থাকায় ওই সময়ের ফলাফল রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলেই বিবেচিত হচ্ছে।

বরিশাল-৫ আসনে সর্বোচ্চ সংখ্যকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড গড়েছেন বিএনপির মজিবর রহমান সারোয়ার। তিনি মোট ৫ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বরিশালের রাজনীতিতে নিজেকে একটি শক্ত ও পরীক্ষিত নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে ওই আসনে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মজিবর রহমান সারোয়ার। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। সে সময় আবদুর রহমান বিশ্বাসের ছেলে নাসিম বিশ্বাস বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৮ সালে নাসিম বিশ্বাসের আকস্মিক মৃত্যুতে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সারোয়ার।

পরবর্তীতে ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি বিএনপির ধারাবাহিক আধিপত্য বজায় রাখেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি মাত্র ছয় হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পান, যা আসনটির প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ চরিত্র স্পষ্ট করে। এছাড়া মজিবর রহমান সারোয়ার বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হিসেবে ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন, যা নগর রাজনীতিতে তার প্রভাব আরও দৃঢ় করে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরিশাল-৫ আসনে রাজনৈতিক সমীকরণ নতুন মোড় নিচ্ছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মজিবর রহমান সারোয়ার। তার পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, বাসদের ডা. মনিষা চক্রবর্ত্তী, গণ অধিকার পরিষদের রফিকুল ইসলাম রাসেল এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির মো. নুরুল হুদা চৌধুরীসহ একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

তবে ইসলামী সমমনা ৮ দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বরিশাল-৫ আসনে মুফতি ফয়জুল করিমকে সমর্থন দেওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। সে কারণে বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার মূল লড়াইটি বিএনপির মজিবর রহমান সারোয়ার ও ইসলামী আন্দোলনের মুফতি ফয়জুল করিমের মধ্যেই হয়তে পারে—এমন ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বরিশাল-৫ আসনে নতুন প্রার্থী নন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচন করেন তিনি। ভোটের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন এই আসনে সাড়ে ১১ শতাংশের বেশি ভোট অর্জন করেছিল। সর্বশেষ ২০২৩ সালে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মুফতি ফয়জুল করিম ৩৩ হাজার ৮২৮ ভোট পান। নির্বাচনের পর ফল বাতিল ও তাকে মেয়র ঘোষণা করার দাবিতে আদালতে আবেদন করা হলেও চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেন।

মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বলেন, “বরিশাল আমার জন্ম-আমার বাবা-দাদার জন্ম, বরিশালের প্রায় সব আসনেই আমাদের ইসলামী আন্দোলন এখন শক্তিশালী। ইনশাআল্লাহ জোট আমাকে এই আসনে সমর্থন দিবে বলে আমি প্রত্যাশা করি। আশা করছি দুই-এক দিনের মধ্যেই আমাদের ৮দলীয় জোট প্রার্থীদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবেন।”

মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন,”প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবেই। হাতপাখা আর দাঁড়িপাল্লা হয়তো জোট করবে। এ আসনে মানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণ করেছি আমি। জনগণ তাই ধানের শীষে ভোট দিতে উন্মুখ।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না থাকায় বরিশাল-৫ আসনে বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকের বিপরীতে ইসলামী আন্দোলনের সংগঠিত ভোট একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। অতীতের ভোটের পরিসংখ্যান বলছে, মুফতি ফয়জুল করিম ধারাবাহিকভাবে তার ভোট বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে মজিবর রহমান সারোয়ারের রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বিএনপির পরীক্ষিত ভোটব্যাংক।
দক্ষিণাঞ্চলের এই ‘হটস্পটে’ নেতৃত্বে শেষ পর্যন্ত কে আসছেন? সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

spot_img
spot_img

সর্বশেষ

সময়ের সেরা