রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। শুক্রবার ২১ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৭ মিনিটে ঢাকার অদূরে নরসিংদী জেলার মাধবদীতে ও ঘোড়াশালে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। ঢাকা অদূরে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হওয়ায় এর প্রভাব একটু বেশি রাজধানীতে অনুভূত হয়। ভূমিকম্পে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মাত্রা ৫ দশমিক ৭ প্রাথমিক ভাবে ঘোষিত হলেও এ ভূমিকম্পের মাত্রা গবেষণায় আরও ৭/৮ মাত্রায় পাবে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তবে প্রাথমিক ভাবে এটি একটি মাঝারি শ্রেণির ভূমিকম্প বলে জানিয়েছেন দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর। তারা জানিয়েছে ভূমিকম্পের স্থায়ীত্ব ছিল প্রায় ২৮ সেকেন্ড। এদিকে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিস) বলছে,রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ৫। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল নরসিংদীর ঘোড়াশাল এলাকায়।
আরমানিটোলার কসাইটুলি এলাকায় আটতলা ভবন ধসে পড়ে। সদরঘাট ও সিদ্দিকবাজার ফায়ার স্টেশন থেকে ২টি ইউনিট সেখানে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঐ ভবনের পলেস্তারার কিছু আলগা অংশ ও কিছু ইট খসে পড়েছিলো বলে জানায় প্রত্যক্ষদর্শী। এছাড়াও একই এলাকায় আরও একটি ভবনের র্যালিং ভেঙ্গে পড়ে তিন পথচারীর মৃত্যু হয়েছে।
খিলগাঁও এ নির্মাণাধীন ভবন থেকে পার্শ্ববর্তী দোতলা ভবনে ইট পড়ে আরও একজন আহত হয়েছেন। বারিধারার ব্লক-এফ রোড-৫-এর একটি বাসায় আগুন লাগার খবর নিশ্চিত করেছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বারিধারা ফায়ার স্টেশনের ২টি ইউনিট অগ্নিনির্বাপনে কাজে নিয়োজিত ছিল। তবে আগুনটি ভূমিকম্পের জন্য কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রাজধানীর সূত্রাপুরের স্বামীবাগ এলাকায় একটি আটতলা ভবন হেলে পড়ে। এটি পাশের অন্য একটি ভবনে আটকে আছে। সূত্রাপুর ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি অনুকূলে আনে। এদিকে ভূমিকম্পে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর বেশ আলোচিত হলেও সেখানে কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। কলাবাগানের আবেদখালী রোড়ে একটি সাততলা ভবন হেলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। মোহাম্মদপুর ফায়ার স্টেশন থেকে একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখবাল করছেন এবং কোন হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ভবন ঠিক আছে,লোকজন আতঙ্কিত হয়ে ফোন করেছিল বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় একটি বাসা বাড়িতে আগুন লাগে। গজারিয়া ফায়ার স্টেশন থেকে দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে।
ভূমিকম্পের পর রাজধানীর বিভিন্ন একালার মানুষ আতঙ্কিত হয়ে সড়কে নেমে আসেন। রাজধানী ঢাকার মতো দেশের, চাঁদপুর, নীলফামারী, সিরাজগঞ্জ,নারায়ণগঞ্জ,পটুয়াখালী,বগুড়া,বরিশাল,মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রামের মহানগরী এবং তার আশপাশ উপজেলায় ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার খবর পাঠিয়েছে আমাদের জেলা উপজেলা প্রতিনিধিরা। এর মধ্যে
নারায়ণগঞ্জ থেকে জানা যায়,সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ভূকম্পন শুরু হয়ে তা কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়। এসময় আতঙ্কিত হয়ে মানুষজন ছুটাছুটি করতে থাকে। জেলার আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা জানান, হঠাৎ জানালার পাশে দেখি পুকুরের পানিতে প্রচুর ঢেউ হচ্ছে। দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে আসি। বাইরে দেখি,আতঙ্কিত মানুষ ঘর থেকে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়ও ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। এদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে খবরে বলা হয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাসহ আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভূমিকম্পে দেশের বিভিন্ন জেলায় এখন পর্যন্ত ৬ (ছয়) জনের মৃত্যুর নিশ্চিত করা গেছে। এর মধ্যে তিনজন রাজধানীর বংশালে ভবনের রেলিং ধসে নিহত হয়েছেন।নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দেয়াল ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া নরসিংদীতে দুজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা.আবু হোসেন মোহাম্মদ মঈনুল আহসান জানান,ভয়াবহ ভূমিকম্পে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। আহত চিকিৎসাধীনদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর। হতাহতদের চিকিৎসায় দেশের সব হাসপাতালে জরুরি মেডিকেল টিম কাজ করছে বলে জানান তিনি।
সর্বশেষ তথ্য মতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ভূমিকম্পে দেয়াল ধসে ফাতেমা (১) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।নরসিংদীতে দেয়াল ধসে কাজম আলী (৭৩) নামের বৃদ্ধ ও বাসার দেয়াল চাপা পড়ে সিন্দুরপুর ইউনিয়নের ওমর (১০) নামের শিশু নিহত হয়েছে। অপর দিকে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৮ জন। তাদের মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের ২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও জিয়া হলের ছাত্র আরাফাত (২০), অর্থনীতি বিভাগের ২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও জিয়া হলের ছাত্র নুরুল হুদা (২০),মোহাম্মদপুরের কামরুল আলমের মেয়ে সুবিয়া (১৪),ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের বাদশা মিয়ার ছেলে সোহেল (৩৫), মালিবাগ চৌরাস্তা মাটির মসজিদ এলাকার হারুনুর রশিদ (৫৬), মিরেরটেকের ১৬ নম্বর গলি নির্মাণ শ্রমিক আবুল খায়ের (৬০),একই এলাকার রিকশাচালক অজ্ঞাত পুরুষ (৪০), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ও মহসিন হলের আবাসিক ছাত্র তানজিল হোসেন (২৬),খিলগাঁও এলাকার হারুনুর রশিদ (৫৫),ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী ও মহসিন হলের ভিপি সাদিক শিকদার (২৬),রিপন (২৮), বিল্লাল (৬),ফারজানা তানভীর (২৩),প্রভা (১৮),গালিব (১৮),মধু (৩০) ও আরমানিটোলা এলাকার (১৮) সজীব (২২) সহ দেশব্যাপী মৃত্যুর সংখ্যা ৬ ও আহতদের সংখ্যা প্রায় ২৪৫ জন বলে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার শোক বার্তা: ভূমিকম্পে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘরবাড়ি ধসে এবং অন্যান্য দুর্ঘটনায় হতাহতের খবরে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড.মুহাম্মদ ইউনূস। এক শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন এবং সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে উদ্ধার চিকিৎসা ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেন।


