আসন্ন পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দেশের বড় ছয়টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০ লাখ টন খাদ্যপণ্য নিয়ে ৬০০টি লাইটার জাহাজকে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে সাগরে আটকে রেখেছে। এতে একদিকে বাজারে পণ্যের ঘাটতি হওয়ার ভয় দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে জাহাজ সংকটে পণ্য খালাস কার্যক্রম থমকে গেছে।
কেন সাগরেই তৈরি করা হয়েছে ‘ভাসমান গুদাম’?
সাধারণত বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) থেকে পণ্য খালাস করে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে বন্দরে আনা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, একটি লাইটার জাহাজ ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করার কথা। কিন্তু বর্তমানে অনেক জাহাজ ৩০ থেকে ৪০ দিন ধরে সাগরে ও নদীতে ভাসছে।
আমদানিকারকরা কেন এমনটা করছেন? সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিজস্ব গুদামে পণ্য রাখলে সরকারের কাছে মজুতের সঠিক হিসাব থাকে। কিন্তু সাগরে জাহাজ আটকে রাখলে সেই হিসাব সহজে পাওয়া যায় না। এর ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রমজানে পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়ানো সহজ হয়। এছাড়া ডাঙার গুদামের চেয়ে জাহাজে পণ্য মজুত রাখা তুলনামূলক সাশ্রয়ী।
সিন্ডিকেটের কবলে ১০ লাখ টন খাদ্যপণ্য
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে রেকর্ড ১৭৬টি বড় জাহাজ অপেক্ষা করছে। এর মধ্যে ৬১টি জাহাজে রয়েছে গম, ভুট্টা, ছোলা, ডাল ও চিনির মতো প্রয়োজনীয় পণ্য। বড় আমদানিকারকদের মধ্যে আকিজ গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপের পণ্যবাহী প্রায় ৬০০টি লাইটার জাহাজ এখন অলস বসে আছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
আকিজ গ্রুপ: একাই প্রায় ৮০টি লাইটার জাহাজ আটকে রেখেছে।
গমবাহী জাহাজ: কমপক্ষে ১৮৬টি জাহাজ পণ্য নিয়ে অপেক্ষায় আছে।
চিনি ও ডাল: ১৭টি চিনিবাহী এবং ৩০টি ডালবাহী জাহাজ সাগরে ভাসছে।
লাইটার সংকটে থমকে গেছে খালাস কার্যক্রম
চট্টগ্রাম লাইনে চলাচলকারী ১০২০টি লাইটার জাহাজের সিংহভাগই এখন এই আমদানিকারকদের দখলে। প্রায় ৭২০টি জাহাজ পণ্য বোঝাই অবস্থায় নদী ও সাগরে অলস বসে থাকায় নতুন করে আসা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য নামানো যাচ্ছে না। যে জাহাজ ১০ দিনে বন্দর ছাড়ার কথা, সেটি এখন ২৫ থেকে ৩০ দিন ধরে অপেক্ষা করছে। এতে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত জাহাজ ভাড়া (ডেমারেজ) গুনতে হচ্ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার পকেটে গিয়ে পড়বে।
প্রশাসনের কড়া হুঁশিয়ারি ও নির্দেশ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নৌপরিবহন অধিদপ্তর কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে। গত ২২ জানুয়ারি আমদানিকারকদের উদ্দেশে একটি জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপসমূহ :
১. ১৫ দিনের সময়সীমা: কোনো লাইটার জাহাজ ১৫ দিনের বেশি পণ্য ধরে রাখতে পারবে না।
২. ৫ দিনের আল্টিমেটাম: আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে আটকে থাকা জাহাজগুলো খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৩. টাস্কফোর্স গঠন: খুলনা ও ঢাকা অঞ্চলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
৪. জরিমানা ও মামলা: ইতোমধ্যে মুন্সিগঞ্জে দুটি জাহাজকে জরিমানা করা হয়েছে এবং নির্দেশ না মানলে ফৌজদারি মামলার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
রমজানের বাজার কি তবে অস্থির হবে?
বাজারে বর্তমানে চিনির সংকট ও আটা-ময়দার দাম নিয়ে আগে থেকেই অস্থিরতা আছে। এর মধ্যে রমজানের প্রধান পণ্য ছোলা ও ডাল যদি সময়মতো বাজারে না পৌঁছায়, তবে দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। তবে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের বর্তমান তৎপরতা যদি সফল হয় এবং আমদানিকারকরা দ্রুত পণ্য খালাস করেন, তবে বড় কোনো সংকটের হাত থেকে দেশ রক্ষা পেতে পারে।
ভোক্তা সাধারণের প্রত্যাশা, সরকার শুধু চিঠি দিয়েই ক্ষান্ত হবে না, বরং নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত খালাসের বিষয়ে সরাসরি তদারকি করবে। সিন্ডিকেটের এই ‘ভাসমান গুদাম’ সংস্কৃতি বন্ধ না হলে প্রতি বছরই রমজানের আগে সাধারণ মানুষকে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হবে।


