সর্বশেষ

হয়রানি বন্ধ করতে গিয়ে বেকায়দায় সভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন

নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভেঙে গ্রাহকের হয়রানি বন্ধ করতে গিয়ে নিজেই বেকায়দায় পড়েছেন সাভারের সাবরেজিস্ট্রার মো. জাকির হোসেন।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি রেজিস্ট্রিতে ঘুষ, অতিরিক্ত টাকা দাবি ও দালালের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ পদে পদে হয়রানির খবর নিয়মিত ঘটে যাচ্ছে দেশের কোন না কোন স্থানে। এমনকি জমি-জায়গা নিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে ‘সংকটে’ পড়েননি বা ‘জিম্মি’ হতে হয়নি এমন কাউকে পাওয়া বিরল। রেজিস্ট্রি অফিসে জমির রেজিস্ট্রি করতে গিয়ে প্রথমেই সামনে পড়ে ভয়ংকর পিয়ন। তারপর উমেদার, নকলনবিশ সর্বোপরি সাব-রেজিস্ট্রার। দলিল লেখক থেকে ভয়ংকর উমেদার পিয়ন, নকলনবিশের মাধ্যমে গড়ে উঠা সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে কাজ করেন। জমি রেজিস্ট্রি কালে যে পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়, তার একটা অংশ পেতেন সাব-রেজিস্ট্রার। আর এই টাকা আদায় হয় ওমেদার পিয়নের মাধ্যমে। যুগের পর যুগ জমি কেনাবেচার করতে গিয়ে ভয়ংকর ওমেদার পিয়নের গড়ে তোলা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে খাজনা খারিজসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক থাকার পরও দলিল প্রতি মোটা অঙ্কের উৎকোচ না দিলে সাব-রেজিস্ট্রার দলিল স্বাক্ষর করছেন না বলে খোদ দলিল লেখক ও দাতা গ্রহীতারা অভিযোগ করে আসছেন।
এই অভিযোগ থেকে বাদ যায়নি দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাভার সাব রেজিস্ট্রি অফিস। সেখানে পিয়ন থেকে শুরু করে গড়ে উঠা সিন্ডিকেটে প্রবেশ না করলে সাভারে চাকরি করতে পারেননা ভালো কর্মকর্তারা। দায়িত্ব নেয়ার পরই সিন্ডিকেট ভেঙে গ্রাহকের হয়রানি বন্ধের পর আলোচনায় আসেন সাভারের সাব রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন।
মফস্বলে গিয়ে টিকে থাকতে পারলেও ঢাকার সাভারে গিয়ে তাকে পড়তে হচ্ছে সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত মাফিয়াদের হয়রানিতে। নিয়মিত মাসোয়ারাসহ নানা অনৈতিক দাবি মেটাতে না পেরে বিভিন্নভাবে হচ্ছেন হয়রানির শিকার। সেই চক্রে সঙ্গে সবব রেজিষ্ট্রারদের সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে রয়েছেন স্থানীয় ও ঢাকায় কাজ করা কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীও। বদলি করে দেওয়ার হুমকির সঙ্গে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করে চরিত্র হননের মাধ্যমে আলোচনায় নিয়ে আসার কথাও বলছেন তারা।
যদিও গত ১৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় হয়েছে জাকির হোসেন সাভারে যোগদানের প্রথম বছরে। অন্য যে কোন সময় এক বছরে সরকারের যে রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে সাভার সাবরেজিষ্ট্রি অফিস থেকে সেই জায়গায় ১০ মাসে রাজস্ব আয় হয়েছে তিনগুন যা ৬০ কোটি টকার বেশি।
ময়লার ভাগাড়ের মত দলিলের স্তুপ কক্ষে কক্ষে পড়েছিল কয়েক মাস আগেও। সবগুলো কক্ষ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি, নিজের কক্ষ থেকে শুরু করে পুরো সাব রেজিস্ট্রি অফিক সিসিটিভির আওতায় নিয়ে এসেছেন জাকির হোসেন। এছাড়া সাব রেজিষ্ট্রারদের সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন তিনি। এমনও হয়েছে, কার দলিল থেকে কত নেয়া হবে, কাকে কত টাকা দিতে হবে সেটাও ঠিক করে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন শীর্ষ নেতারা।
রেজিষ্ট্রার সমিতির শীর্ষ নেতাদেরকে ঢাকার বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেল ও রেস্ট্রুরেন্টে সাভার অফিসসহ বিভিন্ন সাব রেজিষ্ট্রি অফিসেরর ওমেদার পিয়নদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করতে দেখা যায়। সিন্ডিকেটের বলয় থেকে সাভার অফিস পুরোপুরি বের না হলেও স্বস্তি বোধ করছেন সাভারের দলিল লেখক ও দাতা গ্রহীতারা।
তারা বলছেন, দলিল লেখকরা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি, ওমেদার পিয়নের কথা না শুনলে দলিল হতো না। এজলাশে স্বাক্ষর না করে সাব রেজিষ্টার দলিল স্বাক্ষর করতেন খাস কামড়ায়। সেখানে মেটাতে হতো কয়েকগুন টাকা। তাদের কথা মত টাকা না পেলে দলিল স্বাক্ষর হতো না। এখন ৮/৯ মাস ধরে এমন চিত্র দেখা যায় না, রেজিষ্ট্রি অফিসের সামনে মানুষের আহাজারি নেই।সরাসরি সাব রেজিষ্ট্রারের সামনে গিয়ে করা হচ্ছে দলিল।
এ বিষয়ে সাভারের সাব রেজিষ্ট্রার মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘আগে কি হয়েছে সেটা আমি বলতে চাই না। আমি যোগদান করার পর সানা ওমেদার পিয়নদের দৌরাত্ম্য ও দলিল লেখক থেকে শুরু করে আমাদের সংগঠনের নেতাদের মাধ্যমে গড় উঠা সিন্ডেকেটের মাধ্যমে নানা অপকর্ম চোখে পড়ে। আমি যোগদানের পর থেকে এসব অনিয়ম ঠেকাতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পদে পদে পড়তে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি আসার পর থেকে এখানে কোন ধরণের অনিয়ম হচ্ছে না, অনিয়মের সুযোগ নাই।’
বর্তমানে কোন অনিয়ম হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার সামনে কোন অনিয়ম হচ্ছে না, একবারে তো আর দীর্ঘদিনের অনিয়ম শেষ করা যায় না। আমি যোগদানের পর অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত একজন কর্মচারিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রকৃত অনিয়মকারীরা তো স্পষ্ট হচ্ছে, তবে তাদের বিরুদ্ধে টিকে থাকা কঠিন। আমি চেষ্টা করছি, তবে তা বাস্তবায়ন কঠিন। দৃশ্যমানভাবে কেউ কোন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত হলে ছাড় দিচ্ছি না। এর পরে দলিলের পাতা পরিবর্তন, মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ননঅনিয়ম ধরারপড়ার পরে দুজন ওমেদার পিয়নকে (ইব্রাহিম ও পলাশ) অন্য কাজ দেওয়ার পর থেকেই আমার বিরুদ্ধ শুরু হয়েছে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ।’
কোন হুমকি পাচ্ছেন কি-না জানতে চাইলে জাকির হোসেন বলেন, ‘সেটা তো প্রথম দিন থেকেই পাচ্ছি, প্রথম দিনেই সাংবাদিকদের দিয়ে ভয় দেখানো হয়েছে। তারপর থেকে প্রতিনিয়ত নানা ধরণের হুমকি দেয়া হয়, জাল দলিল করার চাপ আসে, দলিলে অনিয়মসহ নানা চাপ আসে। কয়েকজন সাংবাদিককে টাকা না দিলে নানা ধরণের সংবাদ পরিবেশনের হুমকি দেয়। দুদিন আগেও শীর্ষ একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টারের হুমকি পেয়ছি। তাদের বলে দিয়েছি, আমি অন্যায় অনৈতিকতা করি না, নিউজ করেন। তবে মিথ্যা নিউজ করে চরিত্র হনন কইরেন না।’
থাপ্পড়ের ঘটনা ভালোবাসা থেকে: ১৫ দিন আগে সাভার সাব রেজিস্ট্রি অফিসে ১০-১৫ জন সাংবাদিকদের একটি দল গেলে সেখানে সাব রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের সঙ্গে বাগবিতন্ডা বাধে।
তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কোন কিছু থাকলে সংবাদ প্রকাশ করুন। এভাবে দিনের পর দিন হয়রানি করছেন কেন?’
এ সময় এক সাংবাদিক মিরপুরে মো.জাকির হোসেনের ৭ তলার একটি বাড়ি থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে জাকির হোসেন বলেন, ‘বাড়ি তো আর আমি পকেটে নিয়ে ঘুরছি না, আপনাদের কাছে তথ্য থাকলে লিখে দেন, ভিডিও নিউজ করেন।’
একপর্যায়ে নিজের পিয়নেরর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে সাংবাদিকদের ভিডিও করতে বলেন। তখন সাংবাদিকদের জাকির হোসেন বলেন, ‘আমার কোনো অবৈধ সম্পত্তি নেই। আমি কোনো অনৈতিক কাজ করি না, তারপরেও দিনের পর দিন আপনারা আমাকে হয়রানি করছেন কেন? এটা কি সাংবাদিকতা? আপনাদের কাছে কোন তথ্য থাকলে প্রকাশ করুন, আমার ডিপার্টমেন্ট তার ব্যবস্থা নেবে। শুধু শুধু কাজের বেঘাত ঘটিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নষ্ট করছেন, হয়রানি করছেন, এগুলো বন্ধ করুন।’
ক্ষিপ্ত জাকির হোসেন সাংবাদিকদের এসব ভিডিও করার জন্য নকল নবিশকে থাপ্পড় দিতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে জাকির হোসেন বলেন, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত সাভার অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত করতে গিয়ে সাংবাদিকদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। যারা দুর্নীতিগ্রস্ত তাদের অফিসের অন্য ডিপার্টমেন্টে কাজে দিলে সাংবাদিকরা এসে জড়ো হয়ে নানা হুমকি দিতে থাকে। এমনকি তাদের দাবি না রাখলে চাঁদা দেয়ার জন্য আমাদের সাব রেজিস্ট্রারদের সংগঠনের নেতারাদের ফোন চলে আসে। এগুলোতে আমি আসলেই বিরক্ত, এ ধরণের কিছু সাংবাদিক নামধারীদের জন্য কাজ করার পরিবেশ পাওয়া যায় না।’
এ বিষয়ে থাপ্পড় খাওয়া নকলনবিশ মিজান বলেন, ‘স্যার অত্যান্ত ভালো মানুষ, স্যার চেষ্টা করছেন অফিসটাকে ভালো করার জন্য। কিস্তু সাংবাদিকদের একটি চক্র বিভিন্ন অনৈতিক প্রস্তাব নিয়ে আসে এবং কিছু লোক দ্বারার প্রভাবিত হয়ে স্যারকে সবসময় হয়রানী করে। স্যারকে তারা ইচ্ছা করে বিভিন্ন প্রশ্ন করে খেপিয়ে তোলে। আমার কাছে স্যার একজন ফেরেরস্তা, উরার মত ভালো মানুষ হয় না। আমার সাথে যে আচরণ করেছে, সেটা তিনি ভালোবাসার জায়গা থেকে করেছেন। কারণ স্যার আমাকে ছোট ভাইয়ের মত। দেখেন, আদর করেন। স্যার আমাকে সবসময় আদর করেন, শাসন করেন। ওই দিন সাংবাদিকদের সামনে স্যারর শাশন করেছেন, এটাকে এক শ্রেণির অসাধু সাংবাদিক ভুলবশতভাবে অপপ্রচার করছে।’
তদন্ত নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ: নানাভাবে সাভারের সাব রেজিস্ট্রারের সম্পদের পাহাড় গড়েছেন এমন সংবাদ প্রকাশ হয়। যার ফলে আইন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারি সচিব মো. মইনুদ্দিন কাদিরকে তদন্তের দায়িত্ব দেন মন্ত্রণালয়।
তদন্তের চিঠিতে দুটি পত্রিকার নাম দিয়ে বলা হয়, এসব পত্রিকায় আপনার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় তদন্ত করতে যাবো। কিন্তু রোববার দুপুর বারটায় সাভার সাব রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে প্রায় তিন ঘন্টা আলা কক্ষে সেই দুর্নীতিগ্রস্ত, অন্যকাজে দেয়ায় অফিস ছেড়ে যাওয়া পলাশ, ওমেদার পিয়ন ইব্রাহিম ও সিন্ডিকেটের প্রধান দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সদস্য সচিব মেহেদী হাসানের সঙ্গে। অন্য কাজে নিযুক্ত করা এসব কর্মচারীরাই মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করার সহযোগিতাকারী হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছে।
ওমেদার পিয়ন পলাশ ও ইব্রাহিমের সঙ্গে কথা  তদন্ত কর্মকর্তা মেহেদি ছাড়া অন্য কোন দলিল লেখকের সঙ্গে কথা বলেননি। তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা হয়নি দলিল লেখক সমিতির আহ্বায়ক আকতার হোসেন বেপারীর সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘আমি সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত সেরেস্তাতেই ছিলাম, কোন তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে ডাকেনি বা আসেনি।’
এ বিষয়ে সাভার সাব রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন বলেন, ‘দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার অপরাধে যারা দোষি হওয়ায় ইতোমধ্যে অফিসের এজলাশের বাহিরে অন্য কাজে দেয়া হয়েছে এবং তাদের সকল অপকর্মের সঙ্গে জড়িত শুধুমাত্র তাদের সঙ্গেই ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছেন। অথচ তদন্তের সঙ্গে উনারা সংশ্লিষ্ট নয়। যারা সংশ্লিষ্ট তাদের সঙ্গে কথা বলতে শুনিনি।’
জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘গতকাল আমি গিয়েছিলাম, বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রয়োজন হলে আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলবো।’

spot_img
spot_img

সর্বশেষ

সময়ের সেরা