সর্বশেষ

হরমুজ প্রণালী বন্ধের আশঙ্কায় জ্বালানি বাজারে বিপর্যয়ের সম্ভাবনা

নিউজ ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এই উত্তেজনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী যেটি ওমান ও ইরানের মাঝে অবস্থিত এবং বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল রপ্তানির প্রধান রুট।

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, চলমান সংঘাত আরও তীব্র হলে ইরান হয়তো এই জলপথ অবরোধ করতে পারে বা জাহাজে হামলা চালাতে পারে। ইতিমধ্যেই ১৩ জুন ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা শুরু করার পর থেকে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলছে পাল্টাপাল্টি হামলা। এতে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে উত্তেজনা বহুগুণে বেড়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা :

হরমুজ প্রণালী প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এবং বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত প্রাকৃতিক তরল গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করে। মার্কিন জ্বালানি প্রশাসন জানায়, এই প্রণালী বন্ধ হলে বিকল্প কোনো কার্যকর রুট প্রায় নেই। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে এবং খাদ্য, কাঁচামালসহ প্রায় সব উৎপাদন খাতেই সরাসরি প্রভাব পড়বে।

বিশ্ব জুড়ে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা :

লেবাননের অর্থনীতিবিদ জাসেম আজাকা বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে তেলের দাম এক লাফে ২৫ ডলার বেড়ে ১০০ ডলারের উপরে চলে যেতে পারে। শুধুমাত্র এই আশঙ্কাতেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সম্প্রতি ৬৯ ডলার থেকে বেড়ে ৭৪ ডলারে পৌঁছে গেছে। আজাকা সতর্ক করে বলেন, এভাবে চললে বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্বাভাবিক মুদ্রাস্ফীতির মুখে পড়বে।

চীন-ভারত-জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ায় গভীর প্রভাব :

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ চীন তার অর্ধেক তেলই এই রুটে সরবরাহ পায়। পাশাপাশি ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াও এই প্রণালীতে নির্ভরশীল। সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসির এক বিশ্লেষণ মতে, হরমুজ দিয়ে যাওয়া তেলের ৭৬ শতাংশই যায় এশিয়ায়। ফলে এই অঞ্চলগুলোতে সরবরাহ ব্যাহত হলে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে।

সীমিত বিকল্প রুট, বিপদে উপসাগরীয় অর্থনীতি :

সৌদি আরব ও আমিরাতের বিকল্প পাইপলাইন থাকলেও তা পুরোপুরি সক্ষম নয়। সৌদি ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন হুতি হামলায় প্রায় অকেজো, ফুজাইরাহ পাইপলাইন পুরোপুরি ব্যবহৃত। ইরানের গোরেহ-জাস্ক পাইপলাইনও বন্ধ। ফলস্বরূপ, প্রণালী বন্ধ হলে মাত্র ২.৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিকল্প পথে পাঠানো সম্ভব—যেখানে বর্তমানে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল পাড়ি দেয় হরমুজ দিয়ে।

বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য মন্দার শঙ্কা :

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক সালমান আল-আনসারি বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দেবে। চীন প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে এই প্রভাব যা বিশ্বমন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী শুধু একটি সামুদ্রিক রুট নয়—এটি বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্বের অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এই সংকট নিরসনে কূটনৈতিকভাবে কাজ করা—কারণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ মানে কেবল তেলের সংকট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির উপর এক ভয়ঙ্কর ঝড়ের পূর্বাভাস।

spot_img
spot_img

সর্বশেষ

সময়ের সেরা