পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশে পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে সেন্টমার্টিন। এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। আকারে ছোট হলেও প্রবাল, জীববৈচিত্র্য ও ভূ-রাজনৈতিক কারণে এর গুরুত্ব অনেক। সাম্প্রতিক সময়ে ভ্রমণে সীমাবদ্ধতা আরোপ ছাড়াও নানা কারণে আলোচিত হচ্ছে সেন্টমার্টিন।
আজ ১ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) থেকে ৯ মাসের জন্য প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণ বন্ধ থাকবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দ্বীপটি ভ্রমণের সময়সীমা ৩১ জানুয়ারি শেষ হয়েছে। এ সময়ে বন্ধ থাকবে কক্সবাজার থেকে জাহাজ চলাচল। ফলে কোনো পর্যটকের সেন্টমার্টিন ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ আর থাকছে না।
সাধারণত প্রতি বছরের ১ অক্টোবর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াত করে থাকে। কিন্তু চলতি বছর দুই মাস আগেই সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিল সরকার। অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত পর্যটক ভ্রমণের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কমানো হয়েছে পর্যটকদের দ্বীপে অবস্থানের মেয়াদও।
সেন্টমার্টিন দ্বীপে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ১০ হাজার থাকলেও সারা বছরে সেখানে কয়েক লাখ পর্যটক থাকেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পর্যটকদের অতিরিক্ত চাপ, হোটেলসহ ভারী স্থাপনা, উচ্চশব্দে গান-বাজনা, রাতে আলো জ্বালিয়ে রাখা, পলিথিন ও গাছপালা কেটে ফেলাসহ নানা কারণে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ-প্রকৃতি হুমকির মুখে পড়েছে।
হঠাৎ আলোচনায় সেন্টমার্টিন
অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর পদক্ষেপের কারণে অনেকেই সন্দেহ করছেন- দ্বীপ নিয়ে সরকারের কোনো বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে কিনা? বিশেষ করে দীর্ঘদিন প্রচার করা হচ্ছে-এই দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনী ঘাঁটি করতে চায়।
এ বিষয়ে পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেন, যে প্রচারণাটা চালানো হচ্ছে এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এটা বৈজ্ঞানিকভাবে বলা হয়েছে যে এখানে ঘাঁটি করার কোনো সুযোগ নেই, আয়তনও নেই। এটার গঠন হচ্ছে প্রবাল, এখানে কীভাবে ঘাঁটি হবে। মার্কিন দূতাবাস থেকে এটা স্পষ্ট করা হয়েছে যে এমন কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি, কথাও হয়নি। এখন প্রক্রিয়া শুরু হলো কীভাবে সেন্টমার্টিনকে বাচাঁব। সেন্টমার্টিনকে বাঁচানো গেলে এলাকার মানুষকে বাঁচানো যাবে, শিল্প বাঁচবে, পর্যটনও বাঁচবে।
সেন্টমার্টিন এমন কঠোর বিধিনিষেধের সিদ্ধান্তটি নতুন কিছু নয়। ১৯৯৯ সালের ১৯ এপ্রিল সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার ও টেকনাফ সৈকতসহ দেশের ছয়টি এলাকাকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। এরপর ২০১৮ সালে দেশের একমাত্র এই প্রবাল দ্বীপে পর্যটকদের রাত্রিকালীন অবস্থান নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়, যা শুধু নিষিদ্ধেই সীমিত ছিল না।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, সেন্টমার্টিন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে পরিবেশ মন্ত্রণালয়।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা আর পর্যটনের কারণে সেন্টমার্টিনের তাপমাত্রার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকছে। পাশাপাশি লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে বন উজাড় করা হচ্ছে। এছাড়া কচ্ছপের আবাস ধ্বংস, মিঠাপানির সংকট তীব্র হচ্ছে। এরকম বাস্তবতায় সেন্টমার্টিনের অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। তাই সেন্টমার্টিনকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া উদ্যোগ ইতিবাচক।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে সেন্টমার্টিন নিয়ে আন্তর্জাতিক ওশান সায়েন্স জার্নালের এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, ২০৪৫ সালের মধ্যে দ্বীপটি পুরোপুরি প্রবালশূন্য হতে পারে। বিশ্বজুড়ে বিলুপ্তপ্রায় জলপাই রঙের কাছিম, চার প্রজাতির ডলফিন, বিপন্ন প্রজাতির পাখিসহ নানা বন্য প্রাণীর বাস এই দ্বীপে। এসব প্রাণীও দ্বীপটি ছেড়ে চলে যাবে।
সরকার যে পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে তাতে সেন্টমার্টিনের স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকিতে পড়বে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারী আব্দুল মালেক বলেন, দ্বীপে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ বসবাস করে। দ্বীপের মানুষ এক সময় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও এখন তাদের আয়ের প্রধানতম উৎস পর্যটন। এখন সরকার বলছে, বছরে ২ মাস পর্যটক রাত্রীযাপন করবে। এতগুলো মানুষ দুই মাসের আয় দিয়ে বছরের বাকি দিন কীভাবে চলবে ?
সেন্টমার্টিন নিয়ে রাজনীতি
সেন্টমার্টিন দ্বীপটি জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন ছাড়াও সম্প্রতি ভূ-রাজনীতিতেও এই অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকার পতনের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো সেন্টমার্টিন দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও বিষয়টি অস্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছিলো মার্কিন দূতাবাস।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেন্টমার্টিন দ্বীপটিকে পাওয়ার লক্ষ্যে চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। এজন্য তারা রেজিম চেঞ্জ (সরকার হটানো) চায়। যুক্তরাষ্ট্রের যারা বন্ধু, তাদের শত্রুর প্রয়োজন নেই।
গত ২১ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো দেশের নাম না উল্লেখ করে বলেছেন, এখনও যদি বলি, সেন্টমার্টিন দ্বীপ বা আমাদের দেশ কাউকে লিজ দেব, তাহলে আমার ক্ষমতায় থাকার কোনো অসুবিধা নেই, আমি জানি সেটা। কিন্তু আমার দ্বারা সেটা হবে না। আমাদের দেশের মাটি ব্যবহার করে কোনো জায়গায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাবে, সেটি হতে দেব না।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
সেন্টমার্টিন দ্বীপটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ তা উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কে এম আজাদ চৌধুরী কথায়।
তিনি বলেন, সেন্টমার্টিনের মতো অফসোর দ্বীপ থাকার কারণেই সমুদ্র নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের সঙ্গে মামলায় বাংলাদেশ অনেক বড় সমুদ্র অঞ্চল পেয়েছে। সেন্টমার্টিন না থাকলে বাংলাদেশ এত বড় সমুদ্র অঞ্চল পেত না। সমুদ্রপথে বিশ্বের যে কোনো জায়গায় যাতায়াতের জন্য যে ওপেন সি বা উন্মুক্ত সাগর, সেটি সেন্টমার্টিন থেকে সহজেই ব্যবহার করা যাবে।
এম আজাদ চৌধুরী বলেন, সেন্টমার্টিনে কেউ অবস্থান নিতে পারলে সেখান থেকে পুরো ভূ-খণ্ডকে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এই দিক থেকে সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সেন্টমার্টিনের জীব-বৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক যে সম্পদ রয়েছে তার গুরুত্বও অনেক।
তিনি বলেন, ভূ-রাজনীতিতে কৌশলগত অবস্থান থেকেও সেন্টমার্টিন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যেমন আন্দামান নিকোবর দ্বীপ ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে সেন্টমার্টিন নিয়ে মিয়ানমারের একটা টার্গেট আছে এবং তারা অতীতে একাধিকবার সেন্টমার্টিন দখলের চেষ্টা করেছে। কিন্তু সুযোগ পায়নি।


