সর্বশেষ

শবে বরাত : আত্মশুদ্ধি ও ক্ষমা প্রার্থনার নীরব রাত

এস এম আরজু, চট্টগ্রাম ব্যুরো:

নীরবতা নেমে আসে রাতের আকাশে। শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হলে মুসলমানের হৃদয়ে জন্ম নেয় এক গভীর প্রশান্তি। শা‘বান মাসের মধ্যরাত যা শবে বরাত নামে পরিচিত অনেকের কাছে কেবল একটি ইবাদতের রাত নয় বরং নিজের ভুল ত্রুটি ঝেড়ে ফেলে আল্লাহর দিকে নতুন করে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য সুযোগ।

‘শবে বরাত’ ফারসি শব্দ। ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি বা নাজাত। আরবিতে এ রাতকে বলা হয় লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান, অর্থাৎ শা‘বান মাসের মধ্যরজনী। দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম সমাজে বিশ্বাস প্রচলিত যে, এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষভাবে ক্ষমাশীল হন। ধর্মীয় আলেমরা একবাক্যে স্বীকার করেন, কোরআনে সরাসরি ‘শবে বরাত’ নামে কোনো রাতের উল্লেখ নেই। সূরা আদ-দুখানের ‘বরকতময় রাত’ সংক্রান্ত আয়াত নিয়ে তাফসিরকারদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ এটিকে শবে বরাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মনে করলেও অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, ওই আয়াতে লাইলাতুল কদরের কথাই বলা হয়েছে। ফলে কোরআনের আলোকে শবে বরাতের অবস্থান সুস্পষ্ট নয়, বরং ইঙ্গিতমূলক।

শবে বরাতের গুরুত্ব মূলত হাদিসের বর্ণনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিভিন্ন হাদিসে এসেছে, শা‘বানের মধ্যরাতে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। যদিও এসব হাদিসের কিছু সনদ দুর্বল, তবে একাধিক সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় বহু মুহাদ্দিস এগুলোকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। একটি হাদিসে বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে, এই রাতে শিরককারী ও বিদ্বেষ পোষণকারীরা আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে। এতে স্পষ্ট হয় শুধু বাহ্যিক ইবাদত নয়, বরং অন্তরের পরিশুদ্ধতাই এই রাতের মূল শিক্ষা।

শবে বরাতে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ বা বাধ্যতামূলক ইবাদত নেই। আলেমদের মতে, এই রাতে নফল নামাজ, তওবা ও ইস্তিগফার, কোরআন তিলাওয়াত এবং ব্যক্তিগত দোয়া নিঃশব্দে ও একান্তভাবে আদায় করাই উত্তম। লোকদেখানো আয়োজন কিংবা নির্দিষ্ট নিয়ম বেঁধে দেওয়া ইসলামের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শবে বরাতকে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত কিছু রীতি ও বিশ্বাসের পক্ষে সহিহ দলিল পাওয়া যায় না। যেমন নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাতের বিশেষ নামাজ, ভাগ্যলিপি লেখা নিশ্চিতভাবে ঘোষণা, আতশবাজি বা উৎসবমুখর আয়োজন। আলেমরা এসব পরিহার করে সুন্নাহভিত্তিক আমলের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) সহ বহু আলেমের মতে, শবে বরাতের ফজিলত পুরোপুরি অস্বীকার করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি অতিরঞ্জনও কাম্য নয়। ইসলামের সৌন্দর্য মধ্যপন্থায় এই নীতিতেই তারা বিশ্বাসী। শবে বরাতের মূল শিক্ষা হলো ক্ষমা চাইতে লজ্জা না পাওয়া, হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হওয়া এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নতুন করে পথচলা শুরু করা। এ রাত তাই শুধু ইবাদতের নয়, বরং নিজেকে বদলে নেওয়ার এক নীরব আহ্বান।

শবে বরাত কোনো আনুষ্ঠানিক উৎসবের রাত নয়। এটি একান্তে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার সময়। কোলাহল নয়, নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই রাতের প্রকৃত সৌন্দর্য। যারা এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেন, তাদের জন্য শবে বরাত হয়ে ওঠে আত্মশুদ্ধির এক নতুন সূচনা।

spot_img
spot_img

সর্বশেষ

সময়ের সেরা