ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিরতিহীনভাবে চলা ভোটগ্রহণ শেষ হয় বিকেল সাড়ে ৪টায়। এরপরই শুরু হয় গণনা।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পর আজ দেশের ভোটাররা তাঁদের নতুন প্রতিনিধি বেছে নিলেন। একই সঙ্গে সংবিধানের বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ জানিয়ে গণভোটে অংশ নেন তাঁরা।
রাজধানীর গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে সকালে ভোট দেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা করেন, ‘আজ নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন। আজ আমার জীবনের মহাআনন্দের দিন। বাংলাদেশের সবার জন্য মহাআনন্দের দিন। মুক্তির দিন। দুঃস্বপ্নের অবসান, নতুন স্বপ্নের শুরুর দিন। সবাইকে ঈদ মোবারক।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন সকালে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভোট দিয়ে বলেন, ‘আজকের ঐতিহাসিক ভোটগ্রহণের দিনের শুভসূচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্রায়নের ট্রেনে উঠে গেছে। গণতন্ত্রের এই ট্রেন স্টেশনে পৌঁছাবে—এটা আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সকালে গুলশান মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন। ভোট দিয়ে তিনি শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘নির্বাচন যদি নিরপেক্ষ হয়, বিতর্কহীন হয়, তাহলে আমরা ফলাফল মেনে নেব।’ দুপুরে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের তিনি একথা বলেন।
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন। তিনি বলেন, ‘ভোট শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু, সন্ত্রাস ও দখলমুক্ত, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এই ভোটের মাধ্যমে ১৮ কোটি মানুষের সরকার গঠিত হোক।’ নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ফল মেনে নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সকালে রাজধানীর বেরাইদের এ কে এম রহমতুল্লাহ কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন। ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের ব্যানারে জামায়াতের সঙ্গে জোট গড়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এনসিপির শীর্ষ নেতা বলেন, ‘আমরা সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি।’
সার্বিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনায় চার ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাড়া খেয়ে রাজ্জাক মিয়া (৫৫) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খুলনায় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে মারা যান খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মহিবুজ্জামান কচি (৬০)। বিএনপির অভিযোগ, কেন্দ্রের ভেতরে ভোট চাওয়ার বিরোধিতা করায় প্রতিপক্ষ জামায়াতের লোকজন তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে তিনি মাথায় আঘাত পান। হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে ভোটকেন্দ্রে কর্তব্যরত অবস্থায় জ্ঞান হারিয়ে হেলে পড়েন পোলিং কর্মকর্তা মো. মুজাহিদুল ইসলাম (৪৮)। হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার দুটি ভোটকেন্দ্রে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। গোপালগঞ্জে দুই আনসার সদস্যসহ তিনজন আহত হন।
একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। বাকি ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
নির্বাচনে ইসিতে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫০টি দল অংশ নেয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে ইসি; ফলে দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে—
পুরুষ ভোটার: ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন
নারী ভোটার: ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন
তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার: ১ হাজার ২৩২ জন ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী তরুণ ভোটারের সংখ্যা ৫ কোটির বেশি, যা মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য ও ১ লাখের বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন ছিল।


