সর্বশেষ

পর্যটন খাতে যাচ্ছে সেই অতিথিশালা

মোঃ নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারা প্রান্তে নির্মিত সেই অতিথিশালা ইজারা (লিজ) দিতে যাচ্ছে সেতু বিভাগ। এ জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে। পর্যটন খাতে ব্যবহারের জন্য এটি ইজারা দেওয়া হচ্ছে। এতে নানা কারণে পিছিয়ে থাকা পারকি সমুদ্রসৈকত ভ্রমণে বিদেশি পর্যটকদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়বে।

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্পে যে জায়গায় অতিথিশালা নির্মাণ করা হয়েছে সেটাকে বলা হয় ‘সার্ভিস এরিয়া’। প্রকল্পের শুরুতে সার্ভিস এরিয়া ছিল না। মাঝপথে তা যুক্ত করে প্রায় ৭২ একর জায়গাজুড়ে তৈরি করা হয়েছে নানা স্থাপনা। পারকি সৈকত সংলগ্ন সমুদ্র ঘেঁষে গড়ে তোলা এই অতিথিশালা ‘সাত তারকা’ মানের। এখানে আধুনিক ব্যবস্থার সব বন্দোবস্ত থাকলেও দীর্ঘদিন অলস পড়ে আছে অপচয়ের প্রতীক এই অতিথিশালা।

সেতু বিভাগ বলছে, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম কর্ণফুলী টানেল উদ্বোধন করা হয় ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর। এরপর টানেল চালু করা হলেও সার্ভিস এরিয়ার ব্যবহার নেই। এ জন্য সার্ভিস এরিয়া বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৩০ বছরের জন্য সার্ভিস এরিয়া ইজারা দিতে ১ জুলাই আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আগ্রহী বিনিয়োগকারীরা ২৭ আগস্ট পর্যন্ত দরপত্র জমা দিতে পারবেন। আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, কর্ণফুলী টানেলের সার্ভিস এরিয়ায় রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের ছয় কক্ষবিশিষ্ট আধুনিক সুসজ্জিত একটি বাংলো। আছে ৩০টি রেস্টহাউজ ও বিশ্রামাগার। এছাড়া রয়েছে টানেলের রেপ্লিকা, সম্মেলন কেন্দ্র, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, বিনোদন এলাকা, জিম, রেস্তোরাঁ, হেলিপ্যাড, মসজিদ, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। আছে টেনিস মাঠ ও সুইমিংপুল। মাঝখানে নান্দনিক দুটি সেতু।

আরও রয়েছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও ইতিহাস নিয়ে একটি জাদুঘর। এসব স্থাপনায় বসানো হয়েছে ১ হাজার ১৮২ টন ক্ষমতার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এই সার্ভিস এরিয়া নির্মাণে খরচ হয় প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প এখন লোকসানি। দিনে রক্ষণাবেক্ষণে ৩৭ লাখ টাকার বেশি খরচ হলেও টোল বাবদ আয় হচ্ছে ১০ লাখ টাকার কিছু বেশি। সার্ভিস এরিয়া বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার জন্য ইজারা দিলে কিছু আয় বাড়বে।

দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, নির্বাচিত ইজারাদারকে সার্ভিস এরিয়ার সব স্থাপনা ‘যেমন আছে’ ভিত্তিতে হস্তান্তর করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী ওই সম্পত্তি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং বার্ষিক ন্যূনতম চার কিস্তিতে ভাড়া পরিশোধ করবেন ইজারাদার। সার্ভিস এরিয়ার রুম সার্ভিস, খাবার, ভ্রমণ, সম্মেলন,স্পা ইত্যাদি সেবা চালু করে ইজারাদার মুনাফা অর্জন করবেন এবং এসব সেবার মূল্য নির্ধারণে পূর্ণ স্বাধীনতা পাবেন। তবে দর্শনার্থী বাড়াতে কোনো নতুন নির্মাণ বা কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য ইজারাদারকে সেতু বিভাগের অনুমতি নিতে হবে।

এদিকে, সার্ভিস এরিয়া সংলগ্ন পারকি সমুদ্রসৈকত নানা কারণে পিছিয়ে রয়েছে। এই সৈকতকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সেভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। সৈকত এলাকায় ১৩ দশমিক ৩৩ একর জায়গায় পর্যটন করপোরেশন অত্যাধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও তা ছয় বছরেও শেষ হয়নি। বিনোদন, নিরাপত্তা, অবকাঠামোসহ পর্যটকদের সুবিধার দিক থেকে নানাভাবে পিছিয়ে রয়েছে এই সৈকত। তাছাড়া বিদেশি পর্যটকদের জন্য নেই পর্যাপ্ত সুবিধা। এক্ষেত্রে সাত তারকা মানের সার্ভিস এরিয়াটি পর্যটন খাতে ব্যবহৃত হলে বিদেশি পর্যটক আগমন বাড়ানোর সম্ভাবনা আছে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে নেমে কর্ণফুলী টানেল হয়ে অনায়াসে পারকি সমুদ্রসৈকত বা সার্ভিস এরিয়ায় যাওয়া যাবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় আরও বৃদ্ধি পাবে।

সরকার বলছে, লোকসান ঠেকাতে এবং পরিত্যক্ত এই অতিথিশালাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার উপযোগী করতে এই সিদ্ধান্ত। তবে প্রকৌশল বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন, প্রকল্প চলাকালে স্থায়ী এই ব্যয়বহুল ‘সার্ভিস এরিয়া’ নির্মাণ আদৌ দরকার ছিল কি না। এই সার্ভিস এরিয়ার অজুহাতে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে নেওয়া হয়। যার বেশিরভাগই মূলত লুটপাট হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।

নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগরীর খুব কাছাকাছি এই অতিথিশালা ঠিক কতটা ভায়েবল হবে আমি বুঝতে পারছি না। এখানে মাত্র কয়েকটি পরিবার থাকতে পারবে। সেখান থেকে কত টাকা তুলতে পারবে, সেটা জানি না।’

সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, ‘উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে ইজারা দেওয়া হবে। হোটেল, মোটেল, কনফারেন্স বা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এই এলাকাগুলো ব্যবহৃত হলে সরকার রাজস্ব পাবে, একই সঙ্গে জনগণও মানসম্পন্ন সেবা ভোগ করতে পারবে।’

কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী বলেন, ‘লোকসান কমিয়ে আয় বাড়াতে টানেলের সার্ভিস এরিয়া বেসরকারি খাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন এই সার্ভিস এরিয়া পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।’

spot_img
spot_img

সর্বশেষ

সময়ের সেরা