রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের উন্মুক্ত নিলামে কেনা প্রায় ৫ একর জমি নিয়ে দুই দশক ধরে জটিল আইনি বিরোধ ও জালিয়াতির অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি বহুল আলোচিত মামলা। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ২০০১ সালে বৈধভাবে ক্রয় করা সম্পত্তি দখলে বাধা দিতে ১৯৫৪ সালের একটি ‘মৃত’ দলিল ব্যবহার করে ভুয়া খতিয়ান সৃজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে মামলার তদন্তে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে এক পিবিআই পরিদর্শকের বিরুদ্ধে।
২০০১ সালের ২৯ মার্চ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চিটাগাং জুট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের ৫ একর সম্পত্তি বিক্রির জন্য উন্মুক্ত নিলাম আহ্বান করে। নিলামে হাজী নুরুল ইসলামের পক্ষে তার ছেলে নুরুল আলম অংশ নেন এবং প্রতিষ্ঠানের ৩৬তম বোর্ড সভায় সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হন।একই বছরের ২৪ অক্টোবর ৩৭তম বোর্ড সভায় ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ৫ কোটি টাকার পে-অর্ডার গ্রহণ করা হয়। ৯ ডিসেম্বর ৭৬০৬ ও ৭৬০৭ নম্বর দলিলে ৫ একর জমি হাজী নুরুল ইসলাম ও তার চার ছেলের নামে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়। পরদিন অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে তারা জমির দখল নেন। জমিটি নগরীর খুলশী থানাধীন জাকির হোসেন রোড এলাকায় অবস্থিত।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠানের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান নাছিরাবাদ প্রপার্টিজ লিমিটেড কমিটির বিরুদ্ধে পৃথক দুটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করে। ২০০৫ সালে আদালত একতরফা নিষেধাজ্ঞা খারিজ করেন। ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ, ২০০৩ সালে আগ্রাবাদ সার্কেল ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ১৯৫৪ সালের একটি দলিল ব্যবহার করে নাছিরাবাদ প্রপার্টিজ লিমিটেডের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক মিনহাজ উদ্দিন আহমেদের নামে বিএস খতিয়ান সৃজন করা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট ফাইল গায়েব হয়ে যায়। নুরুল আলমের দাবি, কোম্পানি আইন অনুযায়ী বোর্ড অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের খতিয়ান সৃজনের সুযোগ নেই।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, জমি দখলে বাধা দেওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক হয়রানিমূলক মামলা করা হয়। এমনকি প্রবাসে থাকা ও নাবালক সন্তানকেও সাবালক দেখিয়ে আসামি করা হয়েছে। বিচারিক আদালতে তারা অব্যাহতি পেলেও আপিলের মাধ্যমে হয়রানি অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ। এদিকে ভুয়া খতিয়ান দেখিয়ে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উন্নয়ন চুক্তি ও সিডিএ থেকে নকশা অনুমোদনের চেষ্টা করা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে সিডিএ সেই নকশা স্থগিত করে।
২০২৩ সালে নুরুল আলম ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’-এ চট্টগ্রাম সিএমএম আদালতে মামলা করেন। প্রথমে তদন্তভার পায় সিআইডি। পরে মামলাটি পিবিআই-এ স্থানান্তর করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বাদীপক্ষকে পিবিআই কার্যালয়ে না ডেকে ব্যক্তিগত অফিসে ডেকে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। ঘুষ না দেওয়ায় বিবাদীপক্ষের কাছ থেকে ২ কোটি টাকা গ্রহণ করে আদালতে পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন জমা দেন বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মোজাম্মেল হক বলেন, তিনি কোনো ঘুষ দাবি করেননি এবং তদন্তে বাদীপক্ষ সহযোগিতা করেনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পিবিআই হেডকোয়ার্টার্স থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি মোঃ আলিমুজ্জামানকে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, তদন্ত চলমান থাকায় এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
নাছিরাবাদ প্রপার্টিজ লিমিটেডের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত মহাব্যবস্থাপক মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ তিন বছর আগে চাকরি ছেড়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির আইন কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট তানভীর জাহান চৌধুরী বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় তারা কোনো মন্তব্য করবেন না।
দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সরকারি নিলামে কেনা জমির মালিকানা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। একদিকে জালিয়াতির অভিযোগ, অন্যদিকে তদন্তে ঘুষ বাণিজ্যের দাবি সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন প্রশাসনিক ও আইনি অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে। তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে, বৈধ মালিকানা ও অভিযোগের সত্যতা কতটা প্রমাণিত হবে।


