সর্বশেষ

রাজনীতি আর উদ্ধোধনে সীমাবদ্ধ কালুরঘাটে নতুন সেতু, মৃত্যুর মিছিলে স্বজন হারাদের গগণ বিদারী আর্তনাদ 

কাজী আয়েশা ফারজানা,বোয়ালখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি : উদ্ধোধন হয় কিন্তু দৃশ্যমান হয় না। মাঝে মাঝে শুধু জোড়াতালি দিয়ে ঠিকিয়ে রাখার চেষ্টা। যেন কলা দেখিয়ে মূলো ঝুলানি। কবে যে কালুরঘাটে নতুন সেতুর আলাদিনের চেরাগটি ঝলবে? চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর উপর নির্মিত কালুরঘাটে নতুন সেতুর নির্মাণ কাজ শুধু রাজনীতি আর বার বার উদ্ধোধনে সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে যুগের পর যুগ। ক্ষমতার পালা বদল হয়,রাজনীতিরও পট পরিবর্তন হয়। হয়না শুধু কালুরঘাট সেতু। আশ্বাসে আশ্বাসে সীমাদ্ধ। বিএনপি সরকার, আওয়ামীলীগ সরকার এবং এখন অর্ন্তবতীকালীন সরকার বার বার কাজের উদ্ধোধন করেছেন। কিন্তু নতুন সেতুর দৃশ্যমান কাজ আজ পর্যন্ত কোন সরকার আমলে শুরু হয়নি। যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো মানছেনা ‘ডেড স্টপেজ সিগন্যাল’। এদিকে বাড়ছে একের পর এক দূর্ঘনা।

বাবার কাঁদে সন্তানের লাশ, মেহেদির রং না শুকাতে স্বামী হারানোর যন্ত্রণা, বৃদ্ধ বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান অকালে চলে যাওয়া এ যেন মানুষের হৃয়কে নাড়িয়ে দেয়। যার যায় সে বুঝে। তাদের জায়গায় দাঁড়িয়ে উদ্ধোধন উদ্ধোধন খেলা করা কর্ণধাররা কখনো বুঝবে না এদের ব্যথা।কালুরঘাটের একমুখী সেতুর বহু মুখে কষ্টে এখন আরো বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। স্বজন হারাদের গগণ বিধারী আর্তনাদ আকাশ ভারী হয়ে উঠছে প্রতিদিন।

মানুষের রক্তে রঞ্জিত সেতুর পিচ,লোহার এ্যাঙ্গেল,পাটাতন। প্রিয়জনের চোখের পানি আর রক্তাক্ত মানুষের তাজা রক্ত বৃষ্টির পানিতে গড়িয়ে কর্ণফুলীতে মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি রক্তের ফোটা যেন বলছে আর কত প্রাণ বলি হলে অভিশাপ মুক্ত হবে বোয়ালখালীর অসহায় মানুষ। তবুও ঘুম ভাঙ্গে না কারো। বোয়ালখালীর মানুষগুলোকে পিষে দিয়ে রক্তের উপর দিয়ে বুক ছিড়ে ট্রেন যায় প্রতিদিন। তবুও যেন কোন ভ্রæ ক্ষেপ নেই কারো।

এ যেন কারো দায় নেই। দায় শুধু বোয়ালখালীবাসির। একটি সেতুর জন্য কত হাপিত্যেষ। তবুও কপাল খুলে না অবহেলিত বোয়ালখালীর মানুষের। টনক নড়েনা কর্তৃপক্ষের। রাজনীতির বেড়াজালে ঘুরপাক খায় কালুরঘাটে নতুন সেতুর কাজ। বয়সের ভারে ন্বয়ে পড়া শতবর্ষি সেতুর উপর প্রতিদিন ঘটছে বড় ছোট দূর্ঘনা। এভাবে হয়ত একদিন হাজারো মানুষের প্রাণহানি নাড়িয়ে দেবে পুরো দেশকে। সাবধান না হলে এভাবে চলতে থাকলে আরো বড় রকমের দূর্ঘনার জম্ম দিতে পারে।

প্রত্যেকবার বিভিন্ন পর্যায়ের সরকার কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মণের স্বপ্ন দেখান ভিত্তির প্রস্তরও উদ্ধোধন করেন। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যমান হয় না। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৪ মে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস কালুরঘাটে নতুন সেতুর কাজ র্ভাচূয়ালি উদ্ধোধন করে গেছেন। মানুষও অনেক আশা নিয়ে বুক বেধেছেন এবার হয়তো নতুন সেতু হবে। কিন্তু আসলে কবে নাগাদ এর কাজ শুরু হবে তা এখনও অস্পষ্ট।

এদিকে গত ৬ জুন সিগন্যাল না মেনে কালুরঘাট সেতুতে কক্সবাজার থেকে আসা পর্যটক এক্সপ্রেসের নিচে পিষে ধুমরে মুছড়ে যায় অটো রিকসা, কার,কাভার ভ্যান,মোটর সাইকেলসহ একাধিক যানবাহন। নিহত হন শিশুসহ দুজন, এ ঘটনায় ২২জন আহত হন। ট্রেনটি ‘ডেড স্টপেজ সিগন্যাল’ না মেনে কালুরঘাট সেতুতে উঠেছিল বলে সংশ্লিষ্ট একজন স্টেশন মাস্টার জানিয়েছেন।

বোয়ালখালীর গোমদন্ডী স্টেশন পার হয়েই কালুরঘাট সেতু। আর সেতু পার হয়ে নগরীর জানে আলী হাট স্টেশন। জানে আলী হাট স্টেশন মাস্টার নেজাম উদ্দিন বলেন, কালুরঘাট সেতু ‘ডেড স্টপেজ সেতু’। প্রতিটি ট্রেন সেতুতে ওঠার আগে দাঁড়িয়ে যাবে। সেখানে ‘ডেড স্টপেজ বুকে’ স্বাক্ষর করতে হয়। পাশাপাশি সেতু পার হওয়ার সময় ১০ কিলোমিটারের বেশি গতি তোলা যায় না।

“বৃহস্পতিবার রাতে পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনটি গোমদন্ডী স্টেশন পার হয়ে ‘ডেড স্টপেজ সংকেত’ না মেনে দ্রুত গতিতে সেতুতে উঠে যায়। সেতুতে একটি অটো রিকশা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পশ্চিম পাশ থেকে পার হওয়া কিছু গাড়ি সেতুতে আটকে ছিল। তখনই দুর্ঘটনা ঘটে।” স্টেশন মাস্টার নেজাম উদ্দিনের দাবি, সেতুতে থাকা গেইটম্যান দূর থেকে রেড সিগন্যাল দেখিয়েছিলেন। কিন্তু পর্যটক এক্সপ্রেসের লোকমাস্টার (চালক) ওই সিগন্যালও মানেনি। ডেড স্টপ বইতে স্বাক্ষর করার কথা থাকলেও সেটা করেননি।”

দুর্ঘটনার পর আয়েশাকে কোলে নিয়ে ছুটছেন তার বাবা। এই ছবিটি ফেইসবুকে ভাইরাল হয়েছে।বৃহস্পতিবার রাত ১০টার পর কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা ঢাকামুখী আন্তঃনগর পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনটি কালুরঘাট সেতুর বোয়ালখালী অংশ দিয়ে প্রবেশের সময় সেতুতে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি অটোরিকশা ও মোটর সাইকেলকে চাপা দেয়। তাতে আহত হন অন্তত ২২ জন। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাদের দুজনের মৃত্যু হয়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচলও ব্যাহত হয়।বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাফরিন জাহেদ জিতি বলেন, “দুর্ঘটনায় আমরা এক শিশুসহ দুই জন মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি।

“বিভিন্ন ভাবে তিনজন নিহতের খবর আসছে। আমরা ভেরিফাই করেছি, তিনজন না, দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে তুষার নামে একজন অটোরিকশার চালক, আয়েশা নামে অপর শিশুটির বয়স দুই বছর।” স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জিতি জানান, তুষারকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আর শিশুটিকে বেসকারি পার্ক ভিউ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আহতদের মধ্যে একজন বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, ১০ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, পাঁচ জন নগরীর বেসরকারি পার্ক ভিউ হাসপাতালে এবং চারজন বোয়ালখালী উপজেলার বেসরকারি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তুষার বোয়ালখালী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাংলাপাড়ায় থাকতেন বলে স্থানীয়দের কাছে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এসআই নূরে আলম আশেক জানান, রাতে আহত অবস্থায় যাদের ওই হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে ছয়জন চিকিৎসাধীন আছেন। একজনের মৃত্যু হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়, দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা নিহত একজন এবং আহত অবস্থায় আরও তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।

spot_img
spot_img

সর্বশেষ

সময়ের সেরা